প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি নতুন ধারণা পুরো পৃথিবীর কাজ করার ধরন বদলে দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ঠিক তেমনই এক পরিবর্তনের নাম। এআই বিশ্ব অর্থনীতি, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেটা সায়েন্স, যা তথ্যকে রূপ দিচ্ছে সিদ্ধান্তে, আর সিদ্ধান্তকে রূপ দিচ্ছে উদ্ভাবনে। একই সঙ্গে ডেটা সায়েন্স হয়ে উঠেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যবসায়িক বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অন্যতম চালিকাশক্তি। ফলে বিশ্বজুড়ে এআই ও ডেটা সায়েন্সে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষা খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি (আইএসইউ) চালু করেছে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং ইন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স প্রোগ্রাম। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) অ্যাডভান্সড সায়েন্স অ্যান্ড কম্পিউটিং অনুষদের অধীনে এই প্রোগ্রামের অনুমোদন দিয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটির ১৫২ ক্রেডিটের বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, রোবোটিকস, সাইবার সিকিউরিটি এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণা, আধুনিক ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। এ ছাড়াও রয়েছে অত্যাধুনিক এআই ইনোভেশন ল্যাব।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে, আগামী বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন পেশাগুলোর মধ্যে থাকবে এআই বিশেষজ্ঞ, ডেটা সায়েন্টিস্ট, মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই, ডেটা অ্যানালিটিক্স, মেশিন লার্নিং এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সফটওয়্যার কোম্পানি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা খাত, টেলিযোগাযোগ, উৎপাদন শিল্প এবং সরকারি সংস্থাগুলোতেও এই দক্ষতার পেশাজীবীদের গুরুত্ব বাড়ছে।
আইএসইউর এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স প্রোগ্রাম থেকে স্নাতক সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় কর্মবাজারেই বিস্তৃত ক্যারিয়ারের সুযোগ তৈরি হবে। তারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই রিসার্চার, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার, বিজনেস অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারবে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প উৎপাদন, কৃষি, শিক্ষা, টেলিযোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতেও তাদের জন্য কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
আইএসইউর এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. হাকিকুর রহমান বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্স এখন শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতি, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের ভিত্তি। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান দিলেই হবে না; বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য এমন প্রকৌশলী তৈরি করা, যারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।’
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী এআই ও ডেটা সায়েন্স সংশ্লিষ্ট দক্ষ পেশাজীবীদের চাহিদা যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এ খাতের পারিশ্রমিকও। বাংলাদেশে ক্যারিয়ারের প্রাথমিক পর্যায়েই দক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী মাসিক বেতন প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা হতে পারে। অভিজ্ঞতা, বিশেষায়িত দক্ষতা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে এই আয় লাখ টাকারও বেশি পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিবাজারে এআই ও ডেটা সায়েন্টিস্টদের বার্ষিক আয় প্রতিষ্ঠান, দেশ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কয়েক হাজার ডলার থেকে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে এআই ও ডেটা সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা শুধু বাংলাদেশের কর্মবাজারেই নয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পেও প্রতিযোগিতামূলক ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
আইএসইউর জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ওয়েভারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যোগ্য শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।
সাশ্রয়ী ব্যয়ে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের দুই কর্ণধারÑ আইএসইউ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার একেএম মোশাররফ হুসাইন ও ভাইস চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুর রহমান সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। আইএসইউর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. আব্দুল আউয়াল খান।
ইউজিসির নির্দেশিকা অনুসারে দেশ-বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের ওবিই পাঠ্যক্রম। যেখানে রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপক ও ইউজিসির সাবেক সদস্য প্রফেসর মনজুর মোরশেদ মাহমুদ, বুটেক্সের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর মোহাম্মদ আবুল কাশেমসহ খ্যাতিমান শিক্ষকবৃন্দ।
মেধা, যোগ্যতা ও অধিকারের ভিত্তিতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ১৪টি বিভিন্ন ধরনের স্কলারশিপ ও টিউশন ফি ওয়েভারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি শিক্ষাসহায়ক নিয়মশৃঙ্খলায় কঠোর নজরদারি রয়েছে। মেয়েদের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে নিরাপদ ক্যাম্পাস, পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ছেলে এবং মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা হোস্টেল সুবিধা।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৫টি অনুষদের অধীনে ৮টি বিভাগ চালু রয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে রয়েছেÑ ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ) ও মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ)। ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের অধীনে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (এএমএম)। আর ফ্যাকাল্টি অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের অধীনে বিএ (অনার্স) ইন ইংলিশ, এমএ ইন ইংলিশ লিটারেচার অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ ও ব্যাচেলর অব ল’ (এলএলবি অনার্স)। রয়েছে মাস্টার অব পাবলিক হেলথ।